ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, নির্যাতন এবং ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগের প্রতিবাদে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশন। মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশে বসবাস করছেন এবং স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, ধর্মীয় বৈষম্য এবং হয়রানির ঘটনা বেড়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের ওপর হামলা, মসজিদে আক্রমণ এবং খ্রিস্টান গির্জায় হামলার অভিযোগ তুলে তিনি এসব ঘটনার নিন্দা জানান এবং ভারত সরকারের প্রতি সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ভারতে ধর্মীয় সহনশীলতা ও বহুত্ববাদ রক্ষায় দেশটির সচেতন নাগরিক সমাজকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশনের সভাপতি এলবার্ট পি. কষ্টা বলেন, ভারতে খ্রিস্টানদের ওপর সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতেও গির্জায় হামলা, ধর্মযাজক হত্যা এবং খ্রিস্টান নারীদের ওপর সহিংসতার মতো বহু ঘটনা ঘটেছে। তিনি এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের দাবি জানান।
এদিকে, বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্মল রোজারিও এবং মহাসচিব হেমন্ত আই. কোড়াইয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও ধর্মীয় অধিকারকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা ও হয়রানির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালন ও উপাসনার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটি সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে জানায়, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সুভাস গ্রামে উগ্রবাদী ব্যক্তিদের একটি দল ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে একটি গির্জায় হামলা চালিয়ে ক্রুশ ভেঙে ফেলে। একই জেলার সোনাপুর এলাকার আরেকটি গির্জাতেও হামলার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া মুর্শিদাবাদ জেলায় এক খ্রিস্টান বিধবাকে ধর্ম পরিবর্তনের জন্য হুমকি দেওয়া এবং মন্দির নির্মাণের উদ্দেশ্যে তার জমি ছেড়ে দিতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগের কথাও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে বাঁকুড়া জেলায় একটি প্রার্থনা সভায় বাধা দেওয়া, বাইবেল জব্দ করা এবং উপাসকদের আটকে রাখার ঘটনাও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশন বলেছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে এমন অভিযোগ সামনে আসা ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবাধিকার এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। সংগঠনটি প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
একই সঙ্গে ভারত সরকারের প্রতি খ্রিস্টানসহ সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন, উপাসনালয়, সম্পত্তি এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মানববন্ধনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু। এছাড়া বক্তব্য দেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আসাদুর রহমান খান, ফাদার এলবার্ট টমাস রোজারিও, রেভারেন্ড ডেভিড ঘোষ, পবিত্র প্রামাণিক এবং জাকশন গমেজ। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

