‘মানব পাচার রোধে প্রয়োজন সচেতনতা, সম্মিলিত উদ্যোগ ও মানবিক দায়বদ্ধতা’
সিলেট, ৩১ জুলাই: আন্তর্জাতিক মানব পাচার দিবস উপলক্ষে সিলেটের খাদিমনগরের পরগনায় অবস্থিত সেন্ট ফ্রান্সিস দ্য সেলস মিশন স্কুলে আলোচনা সভা, প্রার্থনা ও প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়েছে। মানব পাচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, ভুক্তভোগীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং পাচারমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে ধর্মীয় নেতা, সন্ন্যাসিনী, যুব প্রতিনিধি ও বিভিন্ন বয়সী অংশগ্রহণকারীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট ধর্মপ্রদেশের ধর্মপাল পরম শ্রদ্ধেয় বিশপ শরৎ ফ্রান্সিস গমেজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তালিথা কুম বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর সিস্টার যোসেফিন রোজারিও, এসএসএমআই, মাদার তেরেজা সম্প্রদায়ের (MC) সিস্টারবৃন্দ এবং স্থানীয় চার্চ ও সমাজের প্রতিনিধিরা।
দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ও বিশ্বে মানব পাচারের বর্তমান পরিস্থিতি, এর কারণ, ঝুঁকি এবং প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মি. রনি বিশ্বাস। তিনি বলেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বিদেশে উচ্চ আয়ের চাকরির প্রলোভন, অনিয়মিত অভিবাসন এবং অনলাইন প্রতারণা বর্তমানে মানব পাচারের অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি বিশেষ করে তরুণ-তরুণী ও অভিভাবকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
সিস্টার যোসেফিন রোজারিও, এসএসএমআই বলেন, মানব পাচার কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ওপর ভয়াবহ আঘাত। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চার্চ ও নাগরিক সমাজ একযোগে কাজ করলে এ অপরাধ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মাদার তেরেজা সম্প্রদায়ের সিস্টার করুণাময়ী মানব পাচারের শিকার মানুষের পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা এবং সমাজে তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে বিশপ শরৎ ফ্রান্সিস গমেজ বলেন, “মানব পাচার একটি আধুনিক দাসত্ব। এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে প্রত্যেক মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।”
দ্বিতীয় পর্বে মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। একই সঙ্গে পাচারকারীদের অনুতপ্ত হয়ে সৎপথে ফিরে আসা এবং যারা মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করছেন, তাদের নিরাপত্তা ও শক্তির জন্য প্রার্থনা নিবেদন করা হয়। পরে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর প্রতীক হিসেবে অংশগ্রহণকারীরা হাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে মানব পাচারমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে ৭ থেকে ৬০ বছর বয়সী মোট ৭৯ জন অংশগ্রহণকারী ও অতিথি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক ছিল ইয়ুথ অ্যাম্বাসেডর টিকে (TK) সিলেট এবং সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন সিস্টার যোসেফিন রোজারিও, এসএসএমআই।
জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস প্রতি বছর ৩০ জুলাই পালিত হলেও স্থানীয় সুবিধার কথা বিবেচনায় সিলেটে এ কর্মসূচি ৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ এখনও মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (TIP) রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ওই বছরে সরকারিভাবে ১,৪৬২ জন মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা আরও ৩,৪১০ জন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে অজ্ঞতা, ভুয়া চাকরির প্রলোভন, নারী ও শিশুর প্রতি বৈষম্য এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের তৎপরতা মানব পাচারের প্রধান কারণ। এ কারণে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
এদিকে ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউনিসেফ বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নারী ও শিশুরা এখনও জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, বাল্যবিবাহ, প্রতারণামূলক অভিবাসন এবং বিভিন্ন ধরনের শোষণের মাধ্যমে মানব পাচারের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্য এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

