টানা ভারী বৃষ্টিতে পার্বত্য অঞ্চলে বন্যা ও পাহাড়ধস: ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাথলিক মিশন, বিচ্ছিন্ন খ্রিস্টান অধ্যুষিত পাহাড়ি গ্রাম

গত ৮ জুলাই থেকে টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বান্দরবান ও রাঙামাটার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খ্রিস্টান অধ্যুষিত বহু পাহাড়ি গ্রাম, গির্জা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে বেগ পেতে হচ্ছে।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

বিশেষ করে সাঙ্গু নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বান্দরবানের বলীপাড়া কাথলিক মিশনের অধীনস্থ নিম্নাঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। রুমা, থানচি, বলীপাড়া, রোয়াংছড়ি, আলীকদম ও লামাসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরে টানা বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে।

বলীপাড়া কাথলিক মিশনের সহকারী পাল-পুরোহিত ফাদার সুশীল ইগ্নাসিউস সরেন, সিএসসি বলেন,

“মিশনের নিকটবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো পরিদর্শন করা সম্ভব হলেও দূরবর্তী পাহাড়ি অনেক গ্রামের সঙ্গে এখনো কোনো যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। টানা বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেসব এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতি এখনো জানা সম্ভব হয়নি।”

তিনি আরও জানান, বলীপাড়া কাথলিক মিশন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার পাশাপাশি তাদের জন্য প্রার্থনা অব্যাহত রেখেছে, যাতে দ্রুত বৃষ্টি থামে, বন্যার পানি নেমে যায় এবং মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।

এদিকে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নেও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ১১ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতের প্রবল বর্ষণে ফারুয়া এলাকার গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। যমুনাছড়ি বমপাড়া, একুজ্জ্যাছড়ি, ওরাছড়ি, উলুছড়ি, তারাছড়ি এবং আশপাশের আরও কয়েকটি পাহাড়ি গ্রামে বসবাসকারী পরিবারগুলো এখনো পানিবন্দি রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা গ্যাব্রিয়েল পাংখোয়া জানান, তাদের গ্রামের বিদ্যালয় সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে এবং আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে অনেক পরিবারের খোঁজখবর নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, “২০২৩ সালের বন্যার তুলনায় এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে মনে হচ্ছে।”

এই দুর্যোগে মারমা, ম্রো, খুমি, পাংখোয়াসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর খ্রিস্টান পরিবার ব্যাপক দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী এসব পরিবারের বাজারে যাতায়াত, শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণও কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়িতে ১৩৫টি, রাঙামাটিতে ২১২টি এবং বান্দরবানে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশ ক্যাথলিক মিডিয়া (BCM) দেশের সকল বিশ্বাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, বন্যাকবলিত পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত খ্রিস্টান সম্প্রদায়, ক্যাথলিক মিশন, গির্জা, ধর্মীয় সেবাকর্মী এবং উদ্ধারকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করুন, যেন ঈশ্বর তাদের রক্ষা করেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন এবং এই দুর্যোগের অবসান ঘটে।