ইস্টার সানডে হামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা কলম্বোর কার্ডিনালের

His Eminence Malcolm Cardinal Ranjith | Archdiocese of Colombo


২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে শ্রীলঙ্কায় সংঘটিত ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় দায়ীদের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড ক্যাথলিক মণ্ডলীর শিক্ষার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন কলম্বোর আর্চবিশপ কার্ডিনাল ম্যালকম রঞ্জিত।

গত ১০ আগস্ট এক বিবৃতিতে তিনি হামলার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে শনাক্ত করে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।

২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল ইস্টার সানডেতে শ্রীলঙ্কার তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে প্রায় একই সময়ে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ২৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে ৪২ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন।

হামলার পর থেকেই প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে শ্রীলঙ্কার ক্যাথলিক মণ্ডলী।

রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পর ৩১ জুলাই কলম্বোর স্থায়ী হাইকোর্টের ট্রায়াল-অ্যাট-বার সাবেক পুলিশপ্রধান পুজিথ জয়াসুন্দরা ও সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হেমাসিরি ফার্নান্দোকে ২০১৯ সালের ইস্টার হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

এর আগে ২০২২ সালে তাঁরা খালাস পেয়েছিলেন। তিন বিচারকের বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে নতুন রায় দেওয়া হয় এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে।

আদালতের শুনানিতে উঠে আসে, ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল একটি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলঙ্কাকে ইসলামপন্থী উগ্রবাদীদের সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।

তবে কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি বলে আদালতে তথ্য উপস্থাপিত হয়। ফার্নান্দো ও জয়াসুন্দরাকে ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং চার মাস হেফাজতে রাখার পর তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।

এর আগে একটি দেওয়ানি মামলায় হামলার বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাঁদের ১২৫ মিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

প্রসিকিউশন আদালতে অভিযোগ করে, দুই শীর্ষ কর্মকর্তার অবহেলা গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। পরে দুজনকেই অবহেলার মাধ্যমে ২৭৯ জনের মৃত্যুর জন্য দায়ী সাব্যস্ত করা হয়। পার্লামেন্টারি তদন্তে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জয়াসুন্দরা ও ফার্নান্দো অভিযোগ করেন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি মূল্যায়নের প্রচলিত প্রটোকল অনুসরণ করেননি এবং হামলার পূর্ববর্তী সতর্কতাগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি।

এরই মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার মণ্ডলীর নেতারা সাবেক স্টেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সুরেশ সাল্লেকে গ্রেপ্তারের পর ইস্টার হামলার প্রকৃত সত্য প্রকাশের আহ্বান জানান।

মণ্ডলীর মুখপাত্র ফাদার সিরিল গামিনি ফার্নান্দো বলেন, “ইস্টার হামলার পেছনের সত্য আমরা জানতে চাই। সব ভুক্তভোগীর জন্য আমরা ন্যায়বিচার দেখতে চাই।” বিভিন্ন সরকারকে হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে মণ্ডলী।

এই প্রেক্ষাপটে ১০ আগস্টের বিবৃতিতে কার্ডিনাল ম্যালকম রঞ্জিত বলেন, মৃত্যুদণ্ড আরোপের সঙ্গে ক্যাথলিক মণ্ডলী একমত নয়। ক্যাথলিক মণ্ডলীর ধর্মশিক্ষাগ্রন্থের ২২৬৭ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী। একই সঙ্গে হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারগুলোর প্রতি কলম্বো মহাধর্মপ্রদেশের পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন।

কার্ডিনাল বলেন, হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বা পরিকল্পনাকারীদের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষকে শনাক্ত করে দেশের আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি শ্রীলঙ্কার বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর আস্থা প্রকাশ করে বলেন, বিচারিক কার্যক্রমে মণ্ডলী হস্তক্ষেপ করতে চায় না।

পোপ সাধু জন পল দ্বিতীয়ের ২০০২ সালের বিশ্ব শান্তি দিবসের বার্তা উদ্ধৃত করে কার্ডিনাল বলেন, ব্যক্তিগতভাবে হৃদয় থেকে ক্ষমার আহ্বান থাকলেও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মণ্ডলী প্রতিশোধ চায় না; বরং সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *