চারজন ইতালীয় মিশনারি থেকে দেশব্যাপী গণমাধ্যম সেবা: ভারতে সেন্ট পলের ভগ্নিদের ৭৫ বছর

১৯৫১ সালের ১৮ আগস্ট। তৎকালীন বোম্বে, বর্তমান মুম্বাই শহরে এসে পৌঁছালেন চারজন তরুণ ইতালীয় মিশনারি। তাঁরা হলেন—সিস্টার জেসুয়ালদা অরেলি, সিস্টার পিয়েরলুইসা আলবিনি, সিস্টার মারিয়া এলেনা তেজ্জেলে এবং সিস্টার পাওলা করদেইরো। তাঁদের এই আগমন ছিল ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু সেই পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই ভারতে শুরু হয় এক নতুন ধরনের সুসমাচার প্রচারের যাত্রা।

আজ ৭৫ বছর পর সেই ছোট্ট সম্প্রদায় ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্যাথলিক প্রকাশনা ও গণমাধ্যমভিত্তিক সুসমাচার প্রচার সেবায় পরিণত হয়েছে। সেন্ট পলের ভগ্নিরা (Daughters of St. Paul) তাঁদের ৭৫ বছরের পথচলা ফিরে দেখছে গভীর কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস ও আনন্দের সঙ্গে।

ভারতে সেন্ট পলের ভগ্নিদের আসার ইতিহাস অবশ্য আরও পুরোনো। ১৯৩৭ সালে দিল্লিতে তাঁদের একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় অনুমতি না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। দীর্ঘ ১৪ বছর পর, ১৯৫১ সালে আবার সুযোগ আসে। চারজন তরুণী মিশনারি বোম্বেতে এসে তাঁদের মিশনের ভিত্তি স্থাপন করেন।

ভারতে এসে তাঁদের সামনে ছিল নানা অপরিচিত বাস্তবতা। ভাষা, সংস্কৃতি, আবহাওয়া ও জীবনযাত্রা—সবকিছুই ছিল তাঁদের জন্য নতুন। শুরুতে যোগাযোগ করাও ছিল কঠিন। কিন্তু মানুষের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা ও হাসিমুখ ধীরে ধীরে সেই দূরত্ব কমিয়ে দেয়। তাঁরা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেন এবং দরজায় দরজায় ক্যাথলিক বই পৌঁছে দিতে থাকেন।

সেন্ট পলের ভগ্নিদের সেবার ধরন ছিল অন্যদের থেকে কিছুটা ভিন্ন। সাধারণত ধর্মীয় সিস্টারদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালের সেবার সঙ্গে বেশি পরিচিত করা হলেও তাঁরা বেছে নেন প্রকাশনা, বই ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সুসমাচার প্রচারের পথ। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মানুষের কাছে ঈশ্বরের বাণী ও খ্রিস্টীয় শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া—বই, যোগাযোগ ও পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের গণমাধ্যমের মাধ্যমে।

শুরুর পথটি অবশ্য সহজ ছিল না। অর্থের অভাব, অসুস্থতা, ভাষাগত সমস্যা এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মতো নানা চ্যালেঞ্জ তাঁদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবুও তাঁরা থেমে যাননি। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তাঁদের সম্প্রদায়ে প্রথম ভারতীয় আহ্বান আসে। ভিলে পার্লের ফিলোমেনা তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে তিনি সিস্টার স্কলাস্টিকা ডি’সুজা নামে পরিচিত হন। তাঁর যোগদানের পর আরও অনেক ভারতীয় তরুণী এই মিশনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে এগিয়ে আসেন।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভারতে সেন্ট পলের ভগ্নিদের সেবাও বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৬৫ সালে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান প্রদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭২ সালে ভারত একটি স্বতন্ত্র প্রদেশে পরিণত হয়। সিস্টার পিয়েরলুইসা আলবিনি হন এই প্রদেশের প্রথম প্রাদেশিক সুপিরিয়র।

এই পথচলায় স্থানীয় খ্রিস্টভক্তদের সহযোগিতাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব মিশনারি নতুন দেশে এসে ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলেন, তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্থানীয় অনেক পরিবার। প্রয়োজনীয় খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে তাঁরা সিস্টারদের সহযোগিতা করতেন। দূরে চলে যাওয়ার পরও কিছু মিশনারি তাঁদের মিশনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠিয়ে যেতেন।

ভারতে দীর্ঘদিন সেবা করা সিস্টার ক্রিস্টিয়ানা ডি. আগাসোর স্মৃতিতেও দেশটির প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা উঠে এসেছে। রোমে থাকাকালে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ইউখারিস্টিক কংগ্রেসের টেলিভিশন সম্প্রচার দেখে তাঁর মনে ভারতের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে মিশনারি হিসেবে ভারতে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়। ভারতীয় সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁর ভালোবাসা আরও গভীর হয়। ১৫ বছর সেবা করার পর অন্য মিশনে যাওয়ার নির্দেশ পেলেও ভারত তাঁর হৃদয়ে থেকে যায়। তাঁর ভাষায়, “ভারত সবসময় আমার প্রথম ভালোবাসা হয়ে থাকবে।”

সেন্ট পলের ভগ্নিদের এই ৭৫ বছরের পথচলায় প্রকাশনা একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাঁদের বই ও অন্যান্য প্রকাশনা বহু প্রজন্মের ক্যাথলিক মানুষের কাছে বিশ্বাস, ধর্মীয় শিক্ষা ও সুসমাচারের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাঁদের সেবার পরিধিও আরও বেড়েছে। বর্তমানে তাঁরা বই প্রকাশনার পাশাপাশি ডিজিটাল গণমাধ্যম, বাইবেল অ্যানিমেশন, মিডিয়া লিটারেসি, কাউন্সেলিং এবং পালকীয় প্রশিক্ষণের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন।

বর্তমানে ভারতের ১৭টি শহরে ২০টি কেন্দ্রের মাধ্যমে ১৫৬ জন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সিস্টার এই মিশনে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের কাজের মূল অনুপ্রেরণা তাঁদের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ধন্য থেকলা মেরলো-র সেই ভাবনা—সুসমাচারকে যেন “ডানা ও পা” দেওয়া যায়, যাতে ঈশ্বরের বাণী মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছে যায়।

৭৫তম জয়ন্তী বর্ষে তাঁদের কার্যক্রম শুধু উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁরা বিভিন্ন আধ্যাত্মিক, পালকীয় ও প্রেরিতিক কর্মসূচির পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে নানা দাতব্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা এবং প্রয়োজনীয় মানুষের ঘর মেরামতের মতো কাজেও তাঁরা সহযোগিতা করেছেন। একই সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষায় ১ হাজার ৫২৮টি বাইবেল ও ৩৭৮টি নতুন নিয়মের কপি বিতরণ করা হয়েছে।

ভারতীয় প্রদেশের প্রাদেশিক সুপিরিয়র সিস্টার মাতিলদা ডি’সুজা বলেন, ৭৫তম জয়ন্তী তাঁদের জন্য ছিল “কৃতজ্ঞতার চেতনায়” পূর্ণ একটি সময়। তাঁর মতে, এই উদযাপন তাঁদের মিশনের প্রতি নতুন উদ্যম সৃষ্টি করেছে এবং সেন্ট পলের কন্যাদের আধ্যাত্মিক আদর্শের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর করেছে। একই সঙ্গে প্রথমদিকের মিশনারি সিস্টারদের আত্মত্যাগ ও অবদানের কথাও নতুন করে স্মরণ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সেন্ট পলের ভগ্নিদের ৭৫ বছরের ইতিহাস তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি বিশ্বাস, আত্মত্যাগ, সাহস ও সুসমাচার প্রচারের একটি দীর্ঘ যাত্রার গল্প। ১৯৫১ সালে চারজন তরুণ ইতালীয় মিশনারির মাধ্যমে যে ছোট্ট উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা আজ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত একটি গণমাধ্যমভিত্তিক সুসমাচার প্রচার মিশনে পরিণত হয়েছে।

৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাঁরা শুধু অতীতের সাফল্য স্মরণ করছেন না; বরং বর্তমান সময়ের নতুন গণমাধ্যম ও যোগাযোগের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতেও মানুষের কাছে খ্রিস্টের সুসমাচার পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার নতুন করে গ্রহণ করছেন। চারজন মিশনারির সেই ছোট্ট যাত্রা আজ একটি বড় মিশনে পরিণত হয়েছে—যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটাই আহ্বান: গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে ঈশ্বরের বাণী পৌঁছে দেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *